Home বিনোদন অপরুপ সৌন্দোর্যের মৌলভীবাজারের হাকালুকি

অপরুপ সৌন্দোর্যের মৌলভীবাজারের হাকালুকি

by jonoterdak24
0 comment

 

বিশেষ প্রতিনিধি: আকাশে তুলোর মতো মেঘ, স্নিগ্ধ জলের ঢেউয়ে দুলতে থাকা নৌকা, বাতাসে শিষ কেটে উড়ে যাওয়া চখাচখি আর বালি হাঁস- এমন মোহনীয় অপরূপ প্রকৃতি কেবল হাকালুকি হাওড়েই।

দুদিন থেকেই আকাশের মন খারাপ। জোরে নয়, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। `বিপদ হবে না তো? আমি কিন্তু সাঁতার জানি না।` মাঝি ওবায়দুলকে সতর্ক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে হিমেল। মুচকি হাসি দিয়ে মাথা নাড়ে সে, আশ্বস্ত করে-কিচ্ছু হবে না।

দুপুরের পরে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে উঠে পড়েছি। সঙ্গে হিমেল, হৃদিতা, শ্যামল আর অনিন্দ্য দা। আমি আর হৃদিতা ছাড়া বাকিরা সিলেটি। আশপাশে আরো ইঞ্জিনচালিত ও দাড়বাহী ট্রলার, এই বৃষ্টিতেও জেলেরা মাছ ধরছেন। যাওয়ার সময় দেখতে পেলাম দুই পারের জেলে পরিবারের জীবন সংগ্রামের চিত্র। সেসব দেখতে দেখতে ১৫ মিনিটে পৌঁছে গেলাম ওয়াচ টাওয়ারে।

নিচতলায় সিঁড়িতে বসে পা দুটো হাওরের পানিতে ভিজিয়ে রাখলাম অনেকক্ষণ। তারপর ওপরে উঠে পড়লাম সর্বশেষ তলায়।

সাগরের মতো এক বিশাল জলাশয় যেন। বর্ষার পানিতে একেবারে টইটুম্বুর জলরাশি। এ যেন এক অন্যরকম উন্মাদনা। টাওয়ার মাথায় হৃদিতা অবলোকন করতে থাকে পুরো হাওর। আমিও দেখি, যেদিকে তাকাই সেদিকেই মনে হয় আকাশ মিশে গেছে হাওরের সঙ্গে। টাওয়ার থেকে খুব কাছেই মনে হলো আকাশ। যেন আরেকটু হাত বাড়ালেই ছুতে পারব মেঘ। একটু দূরে তাকাতেই অসংখ্য পাহাড়ের অগ্রভাগ।

বছর দুয়েক আগে যখন এসেছিলাম, তখন শীতকাল। সে সময় দিগন্ত বিস্তৃত প্রাকৃতিক দৃশ্য ও বিলের পাড় ছিল সত্যিই দৃষ্টিনন্দন। শীতকালে অতিথি পাখিরা সারি বেঁধে আসতে থাকে বিলগুলোতে। পরিযায়ী পাখির আগমনে হাওর যেন পরিণত হয় স্বর্গোদ্যানে। যদিও এই বর্ষা মওসুমেও এসেছে কিছু অতিথি পাখি- জানাল ওবায়দুল।

দূরে হাওরের ভেতর নিঃসঙ্গ কিছু হিজলগাছ। অদ্ভুতুড়ে আলপনা এঁকেছে যেন। অথৈ পানিতে গাছগুলো গোটা বর্ষাকাল ডুবে থাকে, পানি সরে যেতেই সে গাছগুলো নতুন কুঁড়ি ছাড়তে শুরু করে জানালেন শ্যামল ভাই।

নিচে এসে নেমে পড়লাম জলে। মিনিট পাঁচেক পর ছোট ছোট মাছ পায়ে ঠোকর কাটতে শুরু করল। এরই মধ্যে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে পুরো শরীর। অনিন্দ্য দা সাঁতার কাটল কিছুক্ষণ, হাওরের শীতল জলে। এই জলে হিমেল বড়ই বেমানান, সাঁতার জানে না ও। টাওয়ারের সিঁড়িতে বসেই মগ দিয়ে গোসল করতে লাগল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। দূরে জেলেদের জাল ফেলতে দেখা যাচ্ছে। ভাটির গানের সুর শোনা যাচ্ছে এখান থেকেও।
`আষাঢ় মাসে ভাসা পানি
পূবালী বাতাসে
বাদাম দেইখ্যা চাইয়া থাকি
আমারনি কেউ আসে…।`

জলজ পাখিরাও মাছের শিকারে চলে আসে হাওরের পানির কাছাকাছি। মাছ ভেসে উঠতেই ছোঁ মেরে ঠোঁটে তুলে নিয়ে উড়াল দেয় আকাশে। কী কী মাছ জিজ্ঞেস করতেই জবাব দিলেন অনন্দ্য দা। “আইড়, চিতল, বাউশ, পাবদা, মাগুর, শিং, কৈ। কোনটা লাগব? ইলিশ পাইবা না!”

সত্যিই তাই। জেলেদের জিজ্ঞেস করলাম, কেউ জাটকা পাচ্ছে না। হাওড়ে ইলিশের কোন খবরই নেই। অথচ টিভিতে কত কী সংবাদ দেখি! কী দারুণ মিথ্যাগুলো লিখি প্রতিদিন!

টাওয়ারে খুব বেশি রাত না করে ফিরতে শুরু করলাম আমরা। সিলেটি ভাষা আয়ত্ব করা সম্ভব না এই অধমের পক্ষে। মাঝি ওবায়দুল শুদ্ধ বাংলা বলতে পারে, বলে রক্ষা। `ওবায়দুল, ভাটির গান জানো?`
`কী কন ভাই? জানুম না?` টিউবলাইটের হাসি দেয় ও। পরক্ষণেই গান ধরে-
`খলাপাড়ার কাচু মিয়া বড় ভাগ্যবান
সোনার একটা মেডেল দিয়া বাড়াইছে সম্মান
মান বাড়িবে গুণ বাড়িবে সকল আল্লাহর দান
জীবন দিয়া রাখবো মোরা তালুকদারের মান।`

ছলাৎ ছলাৎ পানির শব্দ। দূরে জেলে নৌকার কুপির আলো। সন্ধ্যার এই সময়টুকুতে ফিরতে ফিরতে অন্য এক ভালো লাগার অনুভূতি কাজ করল।

কিভাবে যাবেন:  রাজধানীর কমলাপুর ও ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশন থেকে প্রতিদিন ৩টা ট্রেন ছাড়ে সিলেটের উদ্দেশে। সময় লাগবে ৭-৮ ঘণ্টা। ট্রেনে গেলে রাত ৯.৫০টার উপবন এক্সপ্রেসে যাওয়াই সবচেয়ে ভালো। এ ছাড়া বাসেও যাওয়া যাবে। বাসে যেতে চাইলে অনেক বাস আছে। ভোর থেকে শুরু করে রাত ১টা পর্যন্ত এসব বাস পাবেন। বাসে যেতে সময় লাগে চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা। কয়েকটি উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত হাকালুকির অবস্থান হওয়ায় বিভিন্ন পথেই সেখানে যাওয়া যায়। তবে বড়লেখা উপজেলা হয়ে বেড়াতে গেলে পাথারিয়া পাহাড় ও সমনবাগ চা-বাগানের প্রাকৃতিক হ্রদগুলো দেখা যাবে। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলা থেকে কানুনগো বাজার হয়ে অটোরিকশায় প্রথমেই কুলাউড়া বাজারে যাওয়া যায়। সব মিলিয়ে বড়লেখা থেকে দূরত্ব ২০ কিলোমিটারের মতো। বাজার থেকে হাঁটাপথ।

কখন যাবেন : বর্ষা ও শীত উভয় ঋতুই সিলেটে ঘুরে বেড়ানোর জন্য উপযোগী সময়। অন্যান্য দর্শনীয় জায়গাগুলোর সঙ্গে প্রিয়জনকে নিয়ে ঘুরতে যেতে পারেন হাকালুকি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপুর্ব লীলাভূমি হাওরটি বছরের বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে।

কোথায় থাকবেন :  হাওর এলাকায় থাকার জন্য রয়েছে ইজারাদারদের তৈরি করা দোচালা কুটিরগুলো যেখানে কমপক্ষে পাঁচজন থাকা যায়। সেক্ষেত্রে অবশ্যই মালিকের অনুমতি নিতে হবে। তবে এর চেয়ে আরো ভাল হবে তাবু টানিয়ে থাকলে। জ্যোৎস্না রাতের হাওর এলাকা থাকে অন্যরকম দ্যুতিময়।10

Related Posts

Leave a Comment


cheap jerseyscheap jerseyscheap nfl jerseyscheap jerseys from chinacheap mlb jerseyscheap nhl jerseyscheap jerseyscheap nfl jerseyscheap mlb jerseyscheap nfl jerseys