Home রাজনীতি ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব

ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব

by jonoterdak24
0 comment

রুহুল ইসলাম মিঠু: বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন সম্পর্কে লিখতে হলে সে লেখার সমাপ্তি শেষ হয়ে যাবে না। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ও উৎসমূলকে বুঝতে গেলে তার রাজনৈতিক দর্শনের বৈশিষ্ট্য এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কিভাবে বঙ্গবন্ধু এত দূর এগিয়ে ছিলেন, তা সাধারণভাবে স্বপ্নেও ভাবা যায় না। বঙ্গবন্ধুর জন্ম, পূর্ব পারিবারিক ইতিহাস থেকে শুরু করে বাল্যকাল, স্কুল জীবন, কলকাতায় লেখাপড়া সহ ধাপে ধাপে বেড়ে ওঠার নানা পর্যায় ছিল, এত সুন্দর ও আকর্ষণীয়। একজন সুদক্ষ রাজনৈতিক চিন্তাবিদ কিংবা অসাধারণ দক্ষ কর্মী হয়ে ধীরে ধীরে বাঙ্গালীর অবিসংবাদিত নেতা হওয়ার নেপথ্যে বঙ্গবন্ধুর সুস্থ মন মানসিকতা, মুক্তচিন্তা, সুরুচি এবং গণমানুষের প্রতি সীমাহীন দরদ আর ভালোবাসার পুঁজিই ছিল তিনির জীবনের মূল প্রেরণা। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার কৃতি সন্তান শেখ মুজিব যখন স্কুলের ছাত্র তখন ১৯৪০ সালে তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী ও শ্রমমন্ত্রী যথাক্রমে এ.কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী-শেখ মুজিব যে স্কুলে পড়তেন তারা সেখানে গিয়েছিলেন। সেখানের ছাত্র ছেলে শেখ মুজিব অকপটে তার স্কুল সংস্কার সহ নানা দাবী দাওয়া তাদের কাছে তুলে ধরেন তিনি। সেই ছেলেটি পরবর্তীকালে পূর্ববাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের অগ্রনায়কে পরিণত হলেন। তার নেতৃত্বের গুণাবলী প্রকৃতভাবেই তিনির মনে লুকিয়ে ছিল। যা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্র্দীর মতো বিজ্ঞ নেতার দৃষ্টি এড়ায়নি। সেদিন সোহরাওয়ার্দী তিনির নোট বুকে লিখেছিলেন; শেখ মুজিবুর রহমান পরবর্তীকালে সম্ভাবনাময় এক নেতা। কলকাতায় গিয়ে তরুণ মুজিব পড়ালেখা কালে যখন সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে এলেন, সেখানে ও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একজন বিখ্যাত মেধাশীল বাঙালী ছাত্রনেতা হিসেবে তার নাম দাম সারা কলকাতায় ছড়িয়ে পড়েছিল। কলকাতা ছাড়াও দিল্লী, করাচিতে যখন রাজনৈতিক যে বিষয়ে যোগদান করেছেন- সেখানেই তিনি স্বর্কীয় নেতৃত্বের গুণাবলীর স্বাক্ষর রেখেছিলেন। পাকিস্থান প্রতিষ্ঠার পর যে সব স্থানে অংশ গ্রহণের মধ্যে দিয়ে তিনি যে কাজটি বিশেষ ভাবে করার চেষ্টা করতেন তা হলো- পূর্ব বাংলা যাতে উপেক্ষিত না হয়। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে বিশেষ করে সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, তিনি যেন বাংলার কথা বলেন। অবিভক্ত ভারতের বিহারে দাঙ্গা হওয়ার পর দাঙ্গাপীড়িত এলাকায় তিনি কাজ করেন। সাম্প্রদায়িক হানাহানির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান ছিল সোচ্ছার। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় ও ১৯৬৪ সালে ঢাকার দাঙ্গা পীড়িতদের ত্রাতা ছিলেন শেখ মুজিব। তার কাছে রাজনৈতিক দর্শনে ও বিভেদে সে নরহত্যার কোন স্থান ছিল না। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ছাড়া একটি দেশে কল্যাণ সম্ভব নয় এই ছিল শেখ মুজিবের মূল রাষ্ট্র দর্শন। যে বৃহৎ বাংলার আন্দোলনে জড়িয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর শেখ মুজিব পাকিস্থান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলেন। কিন্তু পাকিস্থান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতাদের বিশেষ করে লিয়াকত আলী খানদের আচরণের মধ্যে দিয়ে তিনি বুঝে ফেললেন যে, আমরা প্রতারিত হয়েছি। স্থায়ীভাবে ঢাকায় ফিরে আসার আগে কলকাতায় সিরাজুদ্দৌলা হোটেলে তার ভগ্নি পতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাতকে বলেছিলেন, আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছি তাতে পূর্ব বাংলার কোনো কল্যাণ হবে না। সেজন্য নতুন করে সংগ্রাম করতে হবে। সেই সংগ্রামের অভিপ্রায় নিয়েই শেখ মুজিব ঢাকায় এসে ছাত্রলীগ গঠন করলেন। এরপর ধীরে ধীরে গঠন করলেন আওয়ামী- মুসলিমলীগ ১৯৪৯ সালে। আওয়ামী মুসলিমলীগ থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়েছিলেন ১৯৫৭-এ, সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকেই। তিনি ভাবতে লাগলেন আজীবন একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের। ১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জ মিশন হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আই.এ শ্রেণীতে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৬ সালে ঐ কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ এ তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাষ্ট্র বিজ্ঞান ও ইতিহাসে অনার্স সহ স্মাতক ডিগ্রী লাভ করেন। তখন থেকেই তিনি প্রাদেশিক বেঙ্গল মুসলিমলীগের কর্মী। ১৯৪৩ সনে তিনি সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালের সাধারন নির্বাচনে মুসলিমলীগ তাকে ফরিদপুর জেলার দায়িত্ব প্রদান করে। ১৯৪৭ সালে রাজনৈতিক বিভাজনের পর ১৯৪৮ সালে ঢাকায় আসেন। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। এতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায় সঙ্গত দাবী আদায়ের সংগ্রামে জড়িয়ে পড়লে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ভাল চোখে না দেখে ১৯৪৯ সালে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে। ২০১১ সালের ১৪ই আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুর সেই বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবীতে প্রথম পর্যায়ের আন্দোলনে তরুন ছাত্রনেতা শেখ মুজিব নেতৃত্ব দেন। সে সময় তিনি কারাবরণও করেন। শেখ মুজিব তখনি উপলব্ধি করেন পাকিস্তানের অদ্ভুত ভৌগলিক কাঠামোয় বাঙ্গালীর মুক্তি সম্ভব নয়। সেই থেকে তিনি স্বপ্ন দেখেন স্বাধীন বাংলাদেশের। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তখন ফরিদপুর জেলে অন্তরিন শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে ঢাকার রোজ গার্ডেনে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী-মুসলিমলীগ নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবকে যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত করেন। ১৯৪৯ সালের জুলাই এ জেল থেকে মুক্তি পেয়ে আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানীর সাথে খাদ্য সংকটের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে ভুখা মিছিল করেন। এ আন্দোলন থেকে মাওলানা ভাষানী ও শামসুল হক সহ তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫২ সনে শুরু হয় মহান ভাষা আন্দোলন। তখন তিনি জেলে। ঐ সনের ২১শে ফেব্রুয়ারী পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের বাজেট অধিবেশনের দিনটিকে মহান ভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখন মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীন ১৪৪ ধারা জারী করেন। এ জারী ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত শেখ মুজিব সমর্থন করেন। তাতে অনশন শুরু হয়। ২১শে ফেব্রুয়ারী পুলিশের গুলিতে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার ও শফিউর সহ অনেকে শহীদ হন। এ সময় শেখ মুজিব কারাগারে অসুস্থ হলে ২৭ ফেব্রুয়ারী তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৫২ সালে শেখ মুজিব চীনের রাজধানী পিকিং-এ বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে যোগ দেন। ১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই তিনি পুর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিমলীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে তিনি দলের সভাপতি হবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সে পদেই ছিলেন। ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারী তাঁর বাসভবনে অনুষ্ঠিত সভার মধ্য দিয়ে তিনি আওয়ামীলীগকে পুনরুজ্জীবিত করেন। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী লাহোরে অনুষ্ঠিত হয় বিরোধীদলগুলোর জাতীয় সম্মেলন। এ সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থাপন করেন ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবী। এই ৬ দফাই ছিল বাঙ্গালী জাতির মুক্তি সনদ। ১৯৬৬ সালের ১লা মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামীলীগের সভাপতি ও তাজ উদ্দিন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ঐ বছরের প্রথম ৩ মাস তিনি ৮ বার কারাবরণ করেন। ১৯৬৮ সালে কথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ১নং বিবাদী হিসাবে শেখ মুজিবকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার গেইট থেকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৯ সালে সেই ষড়যন্ত্র মামলার শুনানী হয়। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ঐ মামলার অন্যতম আইনজীবি এবং আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বপালন করেন। তখন ছাত্র ধর্মঘট ও বিক্ষোভে ঢাকা সহ সারা দেশ ফুঁসে উঠে। জয় বাংলা স্লোগানে প্রকম্পিত হয় তখন রাজপথ। পরে শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণের কথা বললেও তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। শেষ পর্যন্ত আয়ুব খান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিল করতে বাধ্য হন। এতে শেখ মুজিব সহ সকল আসামী মুক্তি লাভ করেন। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী ঢাকার রেস কোর্সে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে বিশাল জনসমাবেশে শেখ মুজিবকে গণসংবর্ধনা দেয়া হয়। সেখানে ছাত্রজনতার পক্ষ থেকে সভার সভাপতি তরুন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমদ বাঙ্গালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার ঢল নামে বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত সেই ঐতিহাসিক বিখ্যাত ভাষণ শোনার জন্য। ঐ ভাষনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন: এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। পৃথিবীর ইতিহাসে এই ভাষণ বাঙ্গালী জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহানেতার অবিস্মরনীয় আমাদের স্বাধীনতার মহাকাব্য এটি। ১৯৭২ সালে নবগঠিত স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সংবিধান রচিত হয়। বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় এ সংবিধানে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানের ২৭ ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। ২৮ (২) ধারায় বলা আছে: রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী ও পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন। ২৮ (৩) বলা আছে: কেবল ধর্ম, গোষ্ঠি, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারনে জনসাধারনের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা বাধ্য বাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না। বিশ্বে যতগুলো শ্রেষ্ঠ সংবিধান আছে, বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত আমদের ১৯৭২ এর সংবিধান সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ আবার সরকার গঠন করে। এতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় সাড়ে তিন বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধ বিগ্রহের এই দেশের জনগনের সুখ শান্তির জন্য দেশবাসীর উন্নয়নে অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন তিনি। তিনি নানা প্রতিকুল পরিস্থিতিতে দ্রুত উন্নয়নের পদক্ষেপ নিয়ে একটি আধুনিক সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধীদের তাবেদার এক শ্রেণির উচ্চাবিলাশী সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপদগামী সদস্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে হত্যা করে। পৃথিবীর মধ্যে এই নৃশংস হত্যাকান্ডের শিকার হন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মীনি বেগম ফজিলাতুন্নেছা, তার একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, বঙ্গবন্ধুর জ্যৈষ্টপুত্র শেখ কামাল, দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামাল, কনিষ্ট পুত্র শেখ রাসেল, বঙ্গবন্ধুর পুত্রবধু সুলতানা কামাল ও রোজী কামাল, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শেখ ফজলুল হক মনি ও তার অন্তসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মনি, স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছোটো মেয়ে বেবি সেরনিয়াবাত, কনিষ্ট পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত আব্দুল্লাহ বাবু, ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত, আব্দুল নঈম খান রিন্টু, বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা অফিসার কর্নেল জামিল ও কর্তব্যরত অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ও কর্মচারী সহ ২৬ জন নিরপরাধ মানুষ। পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরনের বর্বরতম হত্যাকান্ড আর কোথাও কোন দেশে ঘটেছে কি না আমাদের জানা নেই। এই হত্যাকান্ডের জন্য বিশ্বের বিবেকবান ধর্ম, বর্ন, নির্বিশেষে জাতি আজও কাঁদে। একজন মহাবীর সংগ্রামী যিনি ভাষা আন্দোলনের পূর্ব থেকে বাঙ্গালী জাতির জন্য একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। যিনি এ দেশকে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন তারই মহা নেতৃত্বে দীর্ঘ ৯ মাসের স্বাধীনতার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বুকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে দেন। তারপর তাকে সপরিবারে হত্যা করা হলো। বঙ্গবন্ধু সারা জীবন বঞ্চিত দু:খী মানুষের জন্য সংগ্রাম করে নিজের প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা, সাম্য ও আত্মতৃপ্তির যে, মহাকাব্য রচনা করে গেছেন, তা অবিনাশী। বঙ্গবন্ধু সপরিবার নিষ্ঠুর খুনীদের বেয়নেট থেকে রক্ষা পায়নি শিশু ও আন্তসত্ত্বা নারী। তাদের সবাইকে প্রাণে মেরে ফেলা হলো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি বিপ্লবের নাম। সেই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার অর্জন সম্ভব হয়েছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গিরিশৃঙ্গের মতই বঙ্গবন্ধুর অবস্থান ও ব্যাপ্তি। বিশিষ্ট কবি ও লেখক অন্নদা শংকর রায়ের উপলদ্ধি যথার্থ, তাই মনে করি।
যতদিন রবে পদ্মা, যমুনা, গৌরী, মেঘনা, বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।
আসলে বঙ্গবন্ধু জাতির জনক, বাঙালীর স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি। তিনি শৃঙ্খলিত জাতির শিকল ভাঙ্গার যুদ্ধের সেনাপতি। তিনি এ জাতির মুক্তিদাতা। তুরস্কের একটি বিশাল সাম্রাজ্য ছিল। তুরস্কের মোস্তফা কামাল পাশা সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে আধুনিক জাতি স্টেট হিসেবে তুরস্কের জন্ম দিয়ে ছিলেন। তার মাধ্যমে তুর্কি জাতি আবার প্রতিষ্ঠা পায় মোস্তফা কামাল পাশার সুযোগ্য নেতৃত্ব দ্বারা। তাই তিনি নব্য তুর্কির জনক আতাতুর্ক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আতাতুর্কের মতো নব্য বাংলাদেশের জনক। আমাদের আগের পরিচয় ছিল পাকিস্থানের পূর্ব বাংলা হিসেবে। টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিবের নাম ও পরিচয়ে তার সুযোগ্য নেতৃত্ব দ্বারা একাত্তরে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা বিশ্বের বুকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পাই। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ‘জনগণের বাহিনী’ বলে উল্লেখ করে ছিলেন। তার বক্তৃতায় তিনি বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর অভিপ্রায় ব্যক্ত করে সেনা সদস্যদের আদর্শবান হওয়ার, সৎ পথে থাকার অঙ্গিকার করে দৃঢ়তার সঙ্গে স্নেহার্দ্র কন্ঠে কবি জীবনান্দ দাশের জননী কবি কুসুম কুমারী দাশের কবিতা থেকে উদ্ধৃত করে ছিলেন, ‘মুখে হাসি বুকে বল, তেজে ভরা মন, মানুষ হতে হবে মানুষ যখন বঙ্গবন্ধুর কৃতজ্ঞতা বোধ , বিনয়, মানুষের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা , আকাশের মতো ছিল তার উদার মন। বঙ্গবন্ধু কর্মীদের ক্ষুদ্র অবদানকে অনেক বড় করে দেখিয়ে তাকে আরও বড় ভূমিকা পালনে উদীপ্ত করার অনুপ্রেরণা দিতেন। বিশাল হৃদয়েরর এই মহামানুষটি সকল রকমের সমস্যা থেকে কর্মীদের আগলে রাখতেন। কোন স্বার্থবাদী ফ্রেমে আবদ্ধ ছিলেন না তিনি। যে কোন স্তরের কর্মী যখন তখন ইচ্ছা করলেই বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে তাদের আনন্দ বেদনা, অভাব-অভিযোগের কথা জানাতে পারতেন। এ কারণেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন সর্বস্তরের বাঙ্লাীর ‘হৃদয়ের নয়ন মণি’। জেল জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন, আর স্বৈর শাসকের রক্ত চক্ষু ছিল শেখ মুজিবের নিত্য সঙ্গি। বঙ্গবন্ধু গণমানুষের মুক্তির আন্দোলন করতে গিয়ে বহুবার নিশ্চিত মৃত্যুর মুখো মুখি হয়ে ছিলেন। অতীতে একাধিক বার ফাঁসির মঞ্চ তৈরী ছিল তার জন্য। বাঙালীর প্রতি নিগুঢ় বিশ্বাস এবং আস্থার ভরসাস্থল ছিল আকাশ চুম্বি। সকল ধরনের প্রতিবন্ধকতা ঠেলে দিয়ে তিনি কোথাও টলেননি। আপোষহীন ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তেমনি আদর্শ ও লক্ষ্য প্রশ্নে তিনি ছিলেন অটল। পূর্বসূরী রবীন্দ্রনাথ, গান্ধি, সুভাষ বসু, নজরুল, দেশবন্ধু, সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলার পথ ও পন্থাকে আত্মস্থ করে নিজস্ব নতুন পথ নির্মাণ করে এগিয়ে গেছেন। তিনি কোথাও থামেননি। পথে পথে পদে পদে রেখে গেছেন অগ্রযাত্রার স্বাক্ষর। হাজার বছর পরে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু নামক এমন নেতা পেয়েছিল। ঘুমন্ত জাতিকে তিনি ইতিহাস রক্ষাকারী বীর ও নতুন একটি মানচিত্রে পরিচয় করে দিয়ে ছিলেন। দীর্ঘ ২৩ বছর সংগ্রাম শেষে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র আমাদের জাতি সত্তার নিজস্ব স্বাধীন ভূখন্ড তৈরী করেন তিনি। একটি পশ্চাতপদ জাতির জীবনে সূর্যের মতো দীপ্ত হয়ে তিনি জেগে আছেন, এই বাংলায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাঙালী জাতির জনক। তিনি জ্েন্মছিলেন এই বাংলায় ১৯১৭ সালের ১৭ মার্চ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পরিবারের ১৭ জন সদস্য সহ নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু এই দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান সপরিবারকে এমন ভয়াবহ হত্যাকান্ড দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। যারা বঙ্গবন্ধু সপরিবারকে হত্যা করে বিদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। সরকার আইনী ভাবে তাদের গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে আদালত বঙ্গবন্ধু হত্যার জড়িতদের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসি দেয়। এখনও বাকি আসামী যারা বিদেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, সরকার তাদের খুঁজে বের করে তাদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার আহ্বান করছি। কারণ বঙ্গবন্ধু খুনিরা বিদেশে বসে এদেশের জনগণ এবং উন্নয়ন অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তাদেরকে অবিলম্বে গ্রেফতার করা হোক। ১৫ আগষ্ট এলে বিএনপি চেয়ারপার্সন জন্ম দিন পালন করেন। যেদিন জাতীয় শোক দিবস সেই দিন দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারী খুনি চক্র বঙ্গন্ধুকে হত্যা করে ছিল। তাদেরকে খুশি রাখতে বিএনপি চেয়ারপার্সন এদিন নিজের জন্ম দিন পালন করেন। তিনির এই জন্ম দিনটা অতি বিতর্কিত। তিনি রাজনৈতিক ভাবে দেউলিয়া হওয়ার কারণে বঙ্গবন্ধুর জাতীয় শোক দিবসে নিজের কথিত জন্ম দিন পালন করেন। যা লজ্জার ব্যাপার বটে। আশা করি জাতীয় এই শোক দিবসে বিএনপি চেয়ারপার্সন সেই বিতর্কিত জন্ম দিন পালন করা থেকে নিজেকে বিরত রেখে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাতীয় শোক দিবস পালনে দো’য়া ও সহযোগীতা কামনার আহ্বান করছি। বঙ্গবন্ধু মরেন নাই। তিনি সমগ্র বাঙালী জাতির কাছে চির অমর হয়ে আছেন।
লেখক-সাংবাদিক,কলামিষ্ট,E-mail:[email protected]

Related Posts

Leave a Comment


cheap jerseyscheap jerseyscheap nfl jerseyscheap jerseys from chinacheap mlb jerseyscheap nhl jerseyscheap jerseyscheap nfl jerseyscheap mlb jerseyscheap nfl jerseys