Home আন্তর্জাতিক মাহে রমজান ও সিয়ামের শিক্ষা

মাহে রমজান ও সিয়ামের শিক্ষা

by jonoterdak24
0 comment

জনতার ডাক :7মাহে রমজানের সওগাত মুসলিম জীবনের এক অনন্য নিয়ামত। বছর ঘুরে রমজান আসে মুক্তির বারতা নিয়ে। এই রমজানে সিয়াম সাধনা মুসলিমদের জীবনে ইবাদতের স্বর্ণদুয়ার খুলে দেয়। মাহে রমজান আসে রহমত, নাজাত ও মাগফিরাতের সওগাত নিয়ে। একটি টেকসই ও আদর্শ জীবন গঠনের শিক্ষা নিয়ে আসে এই রমজান। ইসলাম সাম্য-মৈত্রী, খোদাভীতি, আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি, শৃঙ্খলা, মমত্ববোধ, দান, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের যে মহান শিক্ষা দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের সুযোগ এনে দেয় রমজানের সিয়াম সাধনা। রোজার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জিত হয় : মাহে রমজানের অন্যতম শিক্ষা হচ্ছে তাকওয়া অর্জন। সাওম পালনের মাধ্যমে মনের মধ্যে খোদাভীতি বা আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হয়। আরবি ‘তাকওয়া’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সাবধান হওয়া, সতর্কতা অবলম্বন করা। এর আরো অর্থ হলো—ভয় করা, পরহেজ করা, বেছে বেছে চলা ইত্যাদি। ইসলামের পরিভাষায় আল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয় এবং আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসারে কোনো গর্হিত ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য মনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রবল ইচ্ছাকে তাকওয়া বলা হয়। যার মধ্যে খোদাভীতি বা তাকওয়া আছে, তাকে বলা হয় মুত্তাকি। আর মুত্তাকির স্থান হচ্ছে জান্নাত। মাহে রমজানের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে তাকওয়া অর্জন করা। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ আল কোরআনে সুরা আল-বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেন, ‘ওহে তোমরা যারা ইমান এনেছ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হলো, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ মাহে রমজানের রোজার মাধ্যমে তিরিশ দিন প্রতিনিয়ত আল্লাহকে ভয় করে এবং গুনাহর কাজ থেকে বিরত থেকে রোজাদারদের মধ্যে খোদাভীতির যে গুণ তৈরি হয়, তা তাকে মুত্তাকির মর্যাদায় অভিষিক্ত করে। পরিণামে রোজাদার আখেরাতে সফলতার দিকে এগিয়ে যায়। রোজা ইবাদতের সুযোগ তৈরি করে : রোজা সাধনার মাস, পবিত্রতা অর্জন ও ইবাদতের মাস। এ মাসে রোজাদারদের মন নরম ও পবিত্র থাকে। রোজাদার মাত্রই এ মাসে অধিক ফজিলত লাভ করতে চায়। ক্ষুধার যন্ত্রণা ও প্রবৃত্তির তাড়না থেকে বেঁচে থাকার প্রয়াস রোজাদারের জীবনকে অন্য আঙ্গিকে তৈরি করে। এ সময় রোজাদার বেশি বেশি দৈহিক ও আর্থিক আমল করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ফলে তার প্রতিটি কাজ হয় সুন্দর ও মার্জিত। এ সময় সাওয়াবের নিয়তে রোজাদার বেশি বেশি দান করে, অসহায় ও দরিদ্র মানুষকে অর্থ বা খাবার দিয়ে সাহায্য করে। বছরের অন্য সময় যারা ফরজ নামাজ বা অন্য আমল নিয়মিত আদায় করে না, নফল ও সুন্নতের আমল চর্চা করে না, রোজার সময় সবাই ফরজ তো আদায় করেই, এমনকি সুন্নত ও নফলের দিকেও নজর দেয়। রোজাদার সেহরি ও ইফতারে অন্য রোজাদার ও ক্ষুধার্ত মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে আহার গ্রহণ করার চেষ্টা করে। এতে তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও মমত্ববোধ তৈরি হয়। এ সময় রোজাদার সব ধরনের মিথ্যা, ধোঁকা, প্রতারণার আশ্রয় থেকে বেরিয়ে এসে পরিশীলিত জীবনযাপনের প্রয়াস চালায়। রোজাদার চাকরিজীবী হলে ঘুষ-দুর্নীতি থেকে দূরে থাকে, রোজাদার ব্যবসায়ী হলে ওজনে কম দেওয়া ও মিথ্যা শপথ করে মালামাল বিক্রি করা ও গ্রাহককে ফাঁকি দেওয়া থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করে। রোজার সময় সাধারণ মানুষও আজেবাজে কথা ও কাজ এবং অশোভন আচরণ থেকে বিরত থাকে। ফলে রোজার মাসে সমাজে একটি সুন্দর ও সুখময় আবহ সৃষ্টি হয়। রোজার কারণেই মানুষের মধ্যে সার্বিকভাবে ইবাদতের এই অনুভূতি ও কর্মকাণ্ড চালু হয়। রোজা ধৈর্য, সংযম ও ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রশিক্ষণ দেয় : প্রতিবছর রোজা আসে প্রশিক্ষণের বারতা নিয়ে। এ সময় রোজাদারের মধ্যে ধৈর্য, সহনশীলতা ও ত্যাগের মনোভাব লক্ষ করা যায়। মহানবী (সা.) এক হাদিসে রোজার মাসকে ধৈর্যের মাস বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘রমজান সবরের মাস, আর সবরের পুরস্কার হলো জান্নাত।’—বায়হাকি। ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংযম সাধনার মধ্য দিয়ে বড় কিছু অর্জন করতে হয়। রোজার মাধ্যমে মুত্তাকি হওয়ার যে নিয়ামত এবং তার মাধ্যমে আখেরাতে মুক্তির যে বড় সাফল্য অর্জন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়, তার জন্য ধৈর্য, ত্যাগ ও সংযম সাধনা অতীব প্রয়োজন। আর রোজাদারকে সারা দিন উপোস থাকা, খাবার ও পানীয় মজুদ থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ের আগে তা গ্রহণ না করা, আরামের ঘুম থেকে জেগে উঠে দীর্ঘ এক মাস মধ্যরাতে সেহরি খাওয়া, ইফতারের পর ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর নিয়ে এশার নামাজ ও এর বাইরে আরো ২০ রাকাত তারাবি নামাজ আদায় করা, যথাযথ কারণ থাকা সত্ত্বেও কারো সঙ্গে ঝগড়া-ফাসাদে জড়িয়ে না পড়া, অন্যায়, মিথ্যা ও ভোগের সামগ্রী রোজা রেখে পরিহার করার জন্য সত্যিকার অর্থে চরম ধৈর্য ও সংযমের পারাকাষ্ঠা দেখাতে হয় রোজাদারকে। এভাবে এক মাস রোজাদারের মধ্যে ধৈর্য, ত্যাগ ও সংযমের মনোভাব তৈরি হয়। রোজা সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে : আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সা.) এক হাদিসে রমজান মাসকে সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের মাস বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘রমজান পারস্পরিক সহানুভূতি প্রকাশের মাস।’ বায়হাকি। ধনী বা সম্পদশালী মুসলমানরা সাধারণত অনাহার বা খাবারের অভাব ও এর  বেদনা বুঝতে পারে না। রমজানে সারা দিন রোজা রেখে তারা ক্ষুন্নিবৃত্তির কষ্ট ও উপবাস থাকার জ্বালা উপলব্ধি করতে পারে। ফলে অসহায় ও গরিব মানুষের যে কী কষ্ট তা তারা অনুধাবন করার প্রয়াস পায়। এতে বিত্তহীন ও গরিব-দুঃখীর প্রতি তাদের মনে সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যবোধ তৈরি হয়। তারা সহজেই অনুভব করতে পারে, গরিব ও বিত্তহীনদের প্রতি তাদের হক ও দায়িত্ববোধের কথা। আল্লাহ পাক ধনী বা সম্পদশালী লোকদের প্রতি কিছু দায়িত্ব নির্দেশ করেছেন। অন্য সময় না হলেও রমজানের রোজার সময় ধনীরা অন্তত এই দায়িত্ব ও কর্তব্য স্মরণ করতে পারেন। কোরআনে কারিমে ধনীদের সম্পদে গরিবের অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘তাদের (ধনীদের) সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতের অধিকার।’ (সুরা আল-জারিয়াত, আয়াত-১৯) রোজার দিনে সমাজের ধনী ও বিত্তশালীরা অভাবগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের হক সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠার সুযোগ পান। ফলে তাঁরা জাকাত, ফিতরা ও অন্যান্য দানে তত্পর হন। সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের এমন ঔদার্য আর কোনো সমাজ বা ধর্মে লক্ষ করা যায় না। রোজা আদব, শিষ্টাচার ও আদর্শ চরিত্র শেখায় : রোজার মাস সুন্দর হয়ে চলার মাস। এ মাস শালীনতা ও শিষ্টাচারের পরাকাষ্টা প্রদর্শনের মাস। আর যারা এ সময় সুন্দর ও সঠিক হয়ে চলতে পারে না, তাদের রোজা রাখার মধ্যে মোটেও কল্যাণ নেই। এ কথাই মহানবী (সা.) এক হাদিসে উল্লেখ করেছেন এভাবে, ‘যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা ও কাজ পরিত্যাগ করতে পারেনি, তার খাদ্য ও পানীয় পরিহার করার কোনো প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি) অন্য এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রোজা রাখে, সে যেন কোনো রকম অশ্লীলতা ও হৈ-হুল্লোড় না করে। কেউ যদি তাকে গালি দেয় বা তার সঙ্গে ঝগড়া-ফাসাদ করে, সে যেন উত্তরে বলে, আমি রোজাদার।’ রোজার কারণে অন্যায়, অশ্লীলতা, মিথ্যা-প্রতারণা ইত্যাদি খারাপ কাজ একজন রোজাদার যখন পরহিজ করে, তখন তার মধ্যে শিষ্টাচার, নম্রতা, আদব ও উন্নত চরিত্রের এক মহীয়ান সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো বছরের রোজা কারো কারো জীবনের গতিপ্রকৃতি ও ধ্যান-ধারণাই পাল্টে দেয়। এভাবেই একজন রোজাদার রমজানের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আদর্শ মানুষে পরিণত হয়।   রোজা নিয়মানুবর্তিতা শেখায় : রোজাদারকে একটি নির্দিষ্ট—অর্থাৎ চাঁদ দেখার দিন থেকে রোজা রাখা শুরু করতে হয়। নির্দিষ্ট সময়ে রাতে উঠে সেহরি খেতে হয়, সময়মতো ইফতার করে রোজা ভাঙতে হয়, নিয়ম ও সময়ের মধ্যে সালাতুত তারাবি পড়তে হয়। এভাবে দীর্ঘ এক মাস রোজার বিধানগুলো পালনের মধ্য দিয়ে রোজাদারের জীবনে নিয়মানুবর্তিতার গুণ তৈরি হয়। একজন আদর্শ ও সফলকাম মানুষের জন্য এ গুণ অপরিহার্য। রোজা নাজাত ও মাগফিরাত লাভের সুযোগ আনে : মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর সিয়াম পালন করাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণপ্রসূ, যদি তোমরা জানতে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৪) রোজা পালনের কারণে এবং ইফতার করানোর ফলে রোজাদারের গুনাহ মাফ হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সা.) এক হাদিসে বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে এবং দোজখ থেকে নাজাত দেওয়া হবে।’ রাসুল (সা.) আরো বলেছেন, ‘রোজাদারদের জন্য রয়েছে জান্নাত, আর জান্নাতে প্রবেশে তাঁকে দেওয়া হবে বিশেষ মর্যাদা। মহানবী (সা.) অন্য এক হাদিসে উল্লেখ করেছেন, জান্নাতের একটি দরজা রয়েছে, এর নাম রাইয়ান। কিয়ামতের দিন এই দরজা দিয়ে কেবল রোজাদার প্রবেশ করবে।’ (রিয়াদুস সালেহিন, হাদিস নম্বর-১২১৭) রোজাকে মাগফিরাতের সোপান উল্লেখ করে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ বলেন, সাওম আমারই জন্য। আমি এর যত খুশি বিনিময় দেব।’ (বুখারি ও মুসলিম) রমজান ঐক্য ও সংহতির মাস : রমজানের রোজা মুসলিম উম্মাহর জাতীয় উৎসবের মাস। সারা দুনিয়ার মুসলমানরা রোজার মাসে ঐক্য ও সংহতির এক অনন্য ঐতিহ্য প্রকাশ করে। দুনিয়ার সব মুসলমান রমজানের চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে রোজা আরম্ভ করে এবং শাওয়ালের চাঁদ দেখে রোজার সমাপ্তি টানে। আবার সূর্যোদয়ের আগে সেহরি খাওয়া শেষ করে এবং সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করে। কোথাও এ নিয়মের কোনো হেরফের হয় না। আল্লাহর নির্দেশে সব মুসলমান একই নিয়মে ও সময়ে তারাবি নামাজ আদায় করে এবং ঈদুল ফিতরের ফিতরা প্রদান করে। তারপর সবাই ঈদাগাহে গিয়ে নামাজ আদায় করে, কোলাকুলি করে ঈদের আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে। এভাবে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির এক ঐতিহাসিক সম্পর্ক তৈরি হয়। লেখক : শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও সিনিয়র ব্যাংকার – See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/islamic-life/2016/06/10/368127#sthash.Ms5K92Tp.dpuf

Related Posts

Leave a Comment


cheap jerseyscheap jerseyscheap nfl jerseyscheap jerseys from chinacheap mlb jerseyscheap nhl jerseyscheap jerseyscheap nfl jerseyscheap mlb jerseyscheap nfl jerseys