Home সাহিত্য মা

মা

by jonoterdak24
0 comment

আবদুল কাদের আরাফাত

মা,
ছোট্ট বাবুটা যখন ওর মায়ের হাত ধরে স্কুলে যায় তখন হারিয়ে যাই সেই ছোট বেলায় । তখন স্কুল ড্রেস পরা, চুল আচড়ানো, ভাত খাওয়া, সকল কাজেই মুল অনুসঙ্গ ছিলে তুমি। আমার জন্য ভোর থেকেই ব্যস্ততায় ডুবে থাকতে, চুল আচড়াতে আর বলতে- আমার মানিকটাকে রাজপুত্রের মত লাগছে, ভীষণ খুশী লাগতো তোমার কথায়, তুমিও মুচকি হাসতে , সেই মায়াবী হাসির উজ্জলতা ছিলো সবার চাইতে আলাদা ।
তুমি মাথায় হাত বুলিয়ে না দিলে স্কুলের জন্য রওয়ানা হতাম না, এক সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় তোমায় কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না, পাশের বাড়িতে গিয়েছিলে বোধহয়, ভেজা চোখ মুছতে মুছতে রওয়ানা দিলাম, খানিক পরেই তুমি এসে বুকে জড়িয়ে জিজ্ঞাস করলে- আব্বু কাঁদছো কেন?
মাত্র ঘন্টা পাঁচেকের জন্যইতো স্কুলে যাচ্ছিলাম, অথচ মনে হচ্ছিলো তোমায় যেন কোথাও হারিয়ে ফেলেছি, আসলে আমার পৃথিবী জুড়ে কেবলই তুমি ।
তৃতীয় শ্রেণিতে প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় গণিতে কম নাম্বার পাওয়ায় আব্বুর সামান্য বকুনিতে বালিশে মুখ লুকিয়ে কান্না করছিলাম, টের পেয়ে ছুটে এলে রান্নাঘর থেকে, পিঠে হাত রেখে বললে- এদিকে আসো আব্বু । কি এক জাদুকরী ক্ষমতা ছিলো তোমার এমন ডাক আর হাতের মধুময় স্পর্শের, নিমিষেই মিলিয়ে যেত পাহাড়সম অভিমান । সারাক্ষণ প্রশান্তির সুবাতাস বইতো তোমার ছোঁয়ায় ।

মা,
আচমকা যেদিন আব্বু না ফেরার দেশে হারিয়ে গেলেন আমি তখন সবেমাত্র চতুর্থ শ্রেণীতে উঠেছি, ছোট বোনটি স্কুলেই ভর্তি হয়নি, সংসারের হাল ধরার মত ছিলো না কেউ, পিতৃহীন অবুঝ মন কাঁদতো সারাক্ষণ, শোক কাটিয়ে আগলে রাখলে আমাদের, একাই দিয়েছো মায়ের মমতা আর বাবার শাসন, একটুও পথচ্যুত হতে দাওনি কখনো ।
আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টায় সেলাই মেশিন কিনলে, দিনে সংসারের সব কাজ সেরে রাত জেগে সেলাই করতে, মাঝে মাঝে বলতাম- মা, অনেক হয়েছে, এবার ঘুমাও, খুব ভোরেইতো উঠো । তুমি মুচকি হাসতে, এক সময় ঘুমিয়ে যেতাম, তোমার চোখে কখন ঘুম নামতো জানিনা । সকালে ঘুম ভাঙতো তোমার ডাকে- আব্বু চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, তাড়াতাড়ি আসো ।
এক সপ্তাহে দুই বার ছাতা হারিয়ে অনেকটা বিমর্ষ অবস্হায় বসে আছি, ভীষণ অপরাধী মনে হচ্ছে নিজকে, অভাবের এই সময়ে বাড়তি খরচের কথা বলতে ইচ্ছা করছিলো না, কি অদ্ভুত ক্ষমতা ছিলো তোমার, কিভাবে যেন টের পেতে সব, বললে- কি হয়েছে আব্বূ? মন খারাপ কেন? কারন শুনে বললে- ধুর, সামান্য ছাতার জন্য মন খারাপ করতে হয়? কালই নতুন একটা কিনে দিবো, সীমাহীন মমতায় চোখ ভিজে এলো ।

বছর দুয়েক আগে হঠাৎ খুব অসুস্হ হয়ে পড়ি, তোমায় জানাইনি কিছুই । পর দিন চট্টগ্রাম মেডিকেল এর দিকে যাচ্ছিলাম, পথিমধ্যে তোমার ফোন । রিসিভ করতেই- কেমন আছ আব্বু? শরীর ভাল তো? কাল রাতে স্বপ্ন দেখেছি তুমি খুব অসুস্হ ।
ভাল আছি বলে আশ্বস্ত করলাম কোন মতে, শরীর কেঁপে উঠলো, এও সম্ভব! কিসের তরে এই অদৃশ্য টান এত্ত শক্তিশালী ।অশ্রুজল গড়িয়ে পড়লো, অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো- হে দয়াময়, কোন মাটি দিয়ে বানিয়েছো মাকে ।

তোমায় নিয়ে এমন অজস্র সুখস্মৃতি ঘিরে রেখেছে, যা জীবনযুদ্ধে আমায় হারিয়ে যেতে দেয় না । মাঝে মাঝে আনমনা হয়ে ভাবি – একদিন তুমি থাকবে না, প্রকৃতির নিয়ম মেনে হয়তো মা ছাড়াই বাঁচতে হবে, চোখ ভিজে আসে, দিশেহারা হয়ে পড়ি ।
অনেক কিছুই লেখার ইচ্ছা ছিলো, কিন্তু এ সাধ্য কই! অশ্র ফোটায় বার বার বাধাগ্রস্হ হচ্ছে পুরনো পেন্সিলের লেখার গতি, কেবলই বলতে ইচ্ছে করছে- মা, তোমায় ভীষণ ভালবাসি ।

Related Posts

Leave a Comment


cheap jerseyscheap jerseyscheap nfl jerseyscheap jerseys from chinacheap mlb jerseyscheap nhl jerseyscheap jerseyscheap nfl jerseyscheap mlb jerseyscheap nfl jerseys